Girl in a jacket

ভালুকায় লাইসেন্সবিহিন ১৬ ইটভাটায় অবাধে লাকড়ি ব্যবহার : হুমকীর মুখে পরিবেশ

0

আসাদুজ্জামান ফজলু, দিগন্তবার্তা, ১৮ ডিসেম্বর:-
ময়মনসিংহের ভালুকায় লাইসেন্সবিহিন ১৬ টি ইটভাটা নিয়মনীতির কোন তোয়াক্কা করছেনা। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে দেদাড় কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানো হচ্ছে। ফলে আবাসিক ও ফসলি জমিতে গড়ে উঠা এসব ইটভাটার কালো ধোয়ায় একদিকে যেমন ফসলি জমির মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি অপরদিকে বনাঞ্চল উজাড় হয়ে হুমকীর মুখে পড়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ (যা ১ জুলাই/২০১৪ থেকে কার্যকর) এ বলা হয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা অর্থাৎ জিগজ্যাগ ক্লিন, হাইব্রিড হফম্যান ক্লিন, বার্টিক্যাল শফট ক্লিন, টানেল ক্লিন বা অনুরুপ উন্নততর কোনো প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। তাছাড়া আবাসিক, জনবসতি, সংরক্ষিত এলাকার বনভূমি ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ইটভাটা করা যাবেনা এবং সরকারী বনাঞ্চলের সীমারেখা হতে দুই কিলোমিটার দুরত্বে করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর হতে ছাড়পত্র, জেলা প্রশাসকের অনুমোদন বা লাইসেন্স না নিয়ে ইটভাটা চালু করা যাবেনা। আর এই আইন অমান্য করলে ১০ বছরের কারাদন্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
আর এসব ইটভাটা তদারকি করার জন্য জেলা প্রশাসকের নির্দেশে স্থানীয় বনবিভাগ উপজেলা প্রশাসনের সহযোগীতায় আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান থাকলেও তাদের রহস্যজনক নিরবতার কারণে ভালুকার অধিকাংশ ইটভাটা মালিক এসব আইনের তোয়াক্কা না করে সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে দেদাড় তাদের অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে আশপাশ এলাকার আবাদি জমির উর্বরতা হ্রাসসহ বিভিন্ন প্রজাতীয় ফলজ, বনজ গাছপালাসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকীর সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।
সরেজমিন উপজেলার ধরিয়া পলাশতলী গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, পলাশতলী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তরপাশ ঘেষে তিনটি ইটভাটা। হুমায়ূন কবির খানের আল সাফা, আনিছুর রহমানের রিফাত ব্রিক্স ও জালালউদ্দিন, ধলিয়া গ্রামে অবস্থিত দুলু চৌধুরীর মির্জা ব্রিক্সে, উপজেলার মেদুয়ারী গ্রামে সিদ্দিকুর রহমান ও আনিছুজ্জামানের স্টার ব্রিক্স, মেদিলা গ্রামে ইউপি চেয়ারম্যান শিহাব আমীন খানের দু’টি লাইসেন্স বিহিন ইটভাটাসহ ১৬ টি ইটভাটার প্রায় সবক’টির চারপাশে মজুদ করে রাখা হয়েছে শতশত মন লাকড়ি। চিমনী দিয়ে প্রচন্ড বেগে বের হচ্ছে কালো ধোয়া।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভালুকা উপজেলার খারুয়ালী, ধলিয়া, মেদীলা, মেদুয়ারী, ভান্ডাব, বিরুনীয়া, রাংচাপড়া, শান্তিগঞ্জ, চান্দরাটি ও ভালুকা উপজেলার সীমান্তবর্তী উরাহাটি গ্রামে মনু মিয়া এমএমআর ও পাশের শ্রীপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী ধামলই গ্রামে সুরুজ মিয়ার টিএলআর ব্রিক্সসহ ভালুকার বিভিন্ন এলাকায় ১৬ টি ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটার দু’্একটি ছাড়া কোনটিরই হালনাগাদ লাইসেন্স নবায়ন নেই। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ইটভাটায় শিশু ও নারী শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হয়ে থাকে এমনকি ইট তৈরীতে ৬ থেকে ৭ ধরণের ডাইস ব্যবহার করা হয় এবং ইটের সাইজ ছোট-বড় করে প্রতিনিয়তই ক্রেতাদের সাথে প্রতারণা করা হয়ে থাকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ইটভাটা মালিক জানান, ভালুকার কোন ভাটারই লাইসেন্স নেই। কিভাবে চলে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, স্থানীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসক ও বনবিভাগ থেকে শুরু করে প্রতিটি সেক্টর ম্যানেজ করেই ভাটা পরিচালনা করা হয়ে থাকে। আর এসব ম্যানেজ করে থাকেন উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আফজাল হোসেন মন্ডল।
আল সাফা ব্রিক্সের মালিক হুমায়ন কবির খান জানান, ভালুকায় ১৬ টি ইটভাটা রয়েছে। দু’একটি ছাড়া কোনটারই লাইসেন্স নেই। প্রতিটি ইটভাটা থেকে ভাটা মালিক সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারীকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা দেয়া হয় এবং সার্বিকদিক দেখবাল করার জন্য তাদের উপরই দায়িত্ব রয়েছে।
উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আফজাল হোসেন মন্ডল জানান, ভালুকায় পরিচালিত ইটভাটাগুলোর অধিকাংশেরই লাইসেন্স বা পরিবেশের ছাড়পত্র নেই। সার্বিকদিক ম্যানেজ করেই বরাবর যেভাবে চালানো হয়ে থাকে, এ বছরও সেভাবেই ভাটাগুলো পারিচালিত হয়ে আসছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের পরিচালক ফরিদ আহমেদ জানান, এই অফিসে ভালুকার ২৯ টি ইটভাটার তালিকা রয়েছে। তার মাঝে চলতি বছর ১টি মাত্র ইটভাটার ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। আর ছাড়পত্রহীন ওইসব ভাটা অবৈধভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে জেলার ত্রিশাল, গফরগাঁওসহ বিভিন্ন উপজেলায় অভিযান করা হয়েছে, ভালুকায় যে সকল ইটভাটার পরিবেশের ছাড়পত্র নেই অভিযানের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে অচিরেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাছাড়া এই বিষয়ে নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সাথে কথা বলতে পারেন।
ভালুকা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোজাম্মেল হোসেন জানান, প্রজ্ঞাপনে বনবিভাগ জেলা কমিটির সদস্য মাত্র। আমার অফিসে এ সংক্রান্ত কোন তালিকা নেই বা কোন চিঠিও আসেনি। তবে ভাটায় লাকড়ী পোড়ানোর ব্যাপারে কোন লিখিত অভিযোগ পেলে অভিযানের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ব্যাপারে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা খাতুনের সরকারী মোবাইল নম্বরে বার বার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য দেয়া সম্ভব হয়নি।

Share.

Comments are closed.