Girl in a jacket

ভালুকায় ফ্যাক্টরীর বর্জ্যে এক যুগ ধরে অনাবাদি দুই হাজার একর বোরো জমি

0

আসাদুজ্জামান ফজলু, দিগন্তবার্তা, ১৩ মার্চ:-
ময়মনসিংহের ভালুকায় এক্সপিরিয়েন্স টেক্সটাইল মিলের বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে প্রায় এক যুগ ধরে ৬টি গ্রামের অন্তত ১৬ টি বিলে অবস্থিত কৃষকদের প্রায় দুই হাজার একর বোরো জমি অনাবাদি পড়ে আছে। ফলে কৃষকরা প্রতি বছরে কয়েক হাজার টন ধান উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উপজেলার ভরাডোবা গ্রামে অবস্থিত ওই মিলের বর্জ্য মিশ্রিত দূষিত পানি নিঃসরণ বন্ধের দাবিতে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার মানববন্ধন, মহাসড়ক অবরোধ, ইউএনও অফিস ঘেরাও, বিক্ষোভসহ প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েও কোনো প্রতিকার পায়নি কৃষকরা।
সরেজমিন ঘুরে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার ভরাডোবা ও বিরুনীয়া ইউনিয়নের কাহাচূড়া বিল, হাউড্ডা বিল, খুরুলিয়া বিল, সাধুয়া বিল, ভালুকজানি বিল, গায়লা বিল, তালতলা বিল, কেচুরগোনা বিল, তেইরা বিল, শিমুলিয়া বিল, সাউত্তার কুড়ি, তৌরা বিল, ডিমাইল বিল, মলেঙ্গা বিল, বালিপাথর বিল, কাইল্লানির পাথরের প্রায় দুই হাজার একর জমিতে এক্সপিরিয়েন্স টেক্সটাইল মিলের বর্জ্য মিশ্রিত দূষিত পানির কারণে প্রায় এক যুগ ধরে ওই এলাকার কৃষকেরা তাদের জমিতে ধান লাগাতে পারছেন না। সারা বছরই বিলগুলোতে দূষিত পানি আটকে থাকে। দীর্ঘদিন যাবৎ ধান রোপন না করতে পারার কারণে সবগুলো বিল কচুরিপানা দিয়ে ভরে গেছে। ফলে দু’টি ইউনিয়নের ৬টি গ্রামের কৃষকেরা প্রতি মওসুমে কয়েক হাজার একর জমির বোরো ধান উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যার প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনিতিতেও। এ ছাড়া এসব বিলে সারা বছর বিভিন্ন প্রজাতীয় মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু মিলের বিষাক্ত কালো পানির কারণে এখন আর কোনো মাছ উৎপাদন হয় না। এমনকি বিলের পানিতে নামলে শরীরে চুলকানোসহ আশপাশে বসবাসরত মানুষের শরিরে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। জমিতে দীর্ঘ দিন ধরে কালো পানি জমে থাকায় মাটির ওপরে আলকাতরার মতো স্তর জমে গেছে। তাছাড়া আশপাশের এলাকার বসবাসরত মানুষের বাড়ির টিউবওয়েলের পানিতেও কটু গন্ধ বের হয়। ফলে অনেকেই তাদের পুরাতন টিউবওয়েলের পানি খেতে না পেরে গভীর নলকূপ স্থাপনে বাধ্য হচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একাধিকবার মিলের দূষিত পানি বন্ধের দাবিতে এলাকার নারী-পুরুষ বেশ কয়েক দফায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ওসির দেয়া সমাধানের আশ্বাসে কৃষকেরা অবরোধ তুলে নেয়া হয়। বেশ কয়েক বছর আগে পরিবেশ অধিদফতরের একটি দল সরেজমিন পরিদর্শণ করে নানা অভিযোগ এনে মিল কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিক কারখানা বন্ধের নির্দেশ দিয়ে দুই কোটি ২৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য্য করেন ও ইটিপি ত্রæটিমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত মিল বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন এবং গ্যাস ও বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ করে দেন। কিন্তু কিছু দিন মিলটি বন্ধ রাখার পর রহস্যজনক কারণে আবার তা চালু হলে ফের দূষিত পানির জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ফসলহানি শুরু হয়।
মিল কর্তৃপক্ষ ভরাডোবা থেকে ভালুকা থানার মোড় পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার লম্বা একটি পাইপ লাইন অপরিকল্পিতভাবে স্থাপন করলে খিরু নদীতে বর্জ্যরে লাইন স্থাপন করলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানে পাইপ লাইনটি ভেঙে যায়। এর ফলে ঠিকমতো বর্জ্য পানি খিরু নদীতে না নেমে আশপাশের আরও কয়েকটি এলাকা ছড়িয়ে পরে। এতে ওই এলাকাগুলোও ফসলহানিতে পড়ে। বর্তমানে খিরু নদিতে নামার পাইপটি অকার্য্যকর রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ভালুকা আঞ্চলিক শাখার সদস্যসচিব কামরুল হাসান পাঠান কামাল বলেন, মিলটির দূষিত বর্জ্যরে কারণে প্রায় এক যুগ ধরে ওই এলাকার কৃষরা কোন ফসল ফলাতে পারছেননা। বিষাক্ত রংমিশৃত পানির কারণে জলাশয়ে কোন মাছ নেই। ফসল ও জীববৈচিত্রের এতো ক্ষতিসাধনের পরও বহাল তবিয়তে কিভাবে কারখানাটি চলমান রয়েছে তা আমাদের বোধগম্য নয়।
স্থানীয় কৃষক ও শ্রমীকলীগ নেতা ইব্রাহিম খলিল জানান, আমরা দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এক মন ধানও বাড়িতে নিতে পারছিনা। আমার বাবার ৫ একর জমি থাকার পরও আমাদের চাল কিনে খেতে হয়। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সদয় দৃষ্টি কামনা করছি।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শাহ আলম তরফদার জানান, ফ্যাক্টরীটি আমার ইউনিয়নবাসীকে ধ্বংস করে ফেলেছে। আমি পরিবেশ অধিদপ্তরে একাধিকবার স্বশরীরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু কোন প্রতিকার পায়নি আমার কৃষকেরা। এক সময় আন্দোলনকারীদের নেতা ওয়াইজ উদ্দিন (ওয়াজু মেম্বার) এখন ওই মিল কর্তৃপক্ষের সাথে মিলে নানা রকম সুবিধা নিচ্ছেন। আমরা এর একটা প্রতিকার চাই।
এক্সপিরিয়েন্স মিলের অ্যাডমিন ম্যানেজার সাইফ আহাম্মেদের কাছে এ বিষয়ে জানতে তার মোবাইল নম্বরে ফোন দিলে, ফোনটি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা খাতুন জানান, আমি সরেজমিনে পরিদর্শণ করেছি। কৃষকদের ফসলহানীর চিত্র আমি সং¯িøষ্ট দপ্তরে জানিয়েছি। আশা করছি, ফসলহানির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
পরিবেশ অধিদফতর ময়মনসিংহের পরিচালক ফরিদ আহম্মেদ বলেন, কারখানাটির পরিবেশের ছাড়পত্র নেই। জনশ্রæতিতে রয়েছে, মিল কর্তিপক্ষ সকল দপ্তরকে ম্যানেজ করে কারখানা চালাচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, এমন কোন প্রমান কেউ দিতে পারবেনা। তবে বিষয়টি খুব গুরুত্ব সহকারে দেখবেন বলে তিনি জানান।

Share.

Comments are closed.