Girl in a jacket

ভালুকায় কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে হুমকীর মুখে খিরু নদী ও পরিবেশ

0

আসাদুজ্জামান ফজলু, দিগন্তবার্তা, ২১ ডিসেম্বর:-
ময়মনসিংহের ভালুকা পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত শেফার্ড, আর্টি কম্পোজিট ও কাশর গ্রামের এ্যাডভান্স কম্পোজিটসহ অর্ধশতাধিক ডায়িং ও অন্যান্য ফ্যাক্টরীর বিষাক্ত বর্জ্যে লাউতি ও বিলাইজুড়ি খালসহ বেশ কয়েকটি খাল বিল ও খর¯্রােতা খিরু নদীটি পানিশূণ্য হয়ে এখন মরা খালে রূপ নিয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের রহস্যজনক নিরবতায় অসাধূ ফ্যাক্টরী মালিকদের এসব বেআইনী কর্মকান্ডের কারণে উপজেলার সর্বত্রই প্রকৃতিক পরিবেশ হুমকীর সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।
সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ভালুকায় শিল্পায়নের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় চলছে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ। শিল্পবর্জ্য ফেলে এখানে পরিবেশ দূষণ অব্যাহত রয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত শিল্পবর্জ্য স্থানীয় প্রকৃতি ও জীবন যাত্রায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ভালুকার খিরু নদীর পানির রং বদলে গেছে। বলতে গেলে খিরু এখন আলকাতরার নদী। ঘন জেলির মতো পানি জনস্বাস্থ্যের জন্য এথন মারাত্মক হুমকি।
উপজেলার শিল্পঞ্চল জমিরদিয়া এলাকার কারখানাগুলোর বিষাক্ত বর্জ্য লাউতি খালের পানিকে দূষিত করছে। মেহেরাবাড়ি, ধামশুর, মল্লিকবাড়ি হয়ে এ বর্জ্যদূষণ মিশছে খিরু নদীতে। ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ লাউতি খাল এখন আলকাতরার মতো কালো। ভালুকার নদীর নাম খিরু। এক সময় যার পানি ছিল মিষ্টি ও সুপেয়। এখন বিস্তীর্ণ এ শিল্প বেল্টের পানির অপর নাম বিষের নহর। অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের আগ্রাসনে ভালুকা এখন রীতিমতো বিপর্যস্ত।
ভালুকার খিরু নদীর ৩৫ কিলোমিটার দূষণাক্রান্ত, যা সুতিয়া নদী হয়ে শ্রীপুরের কাওরাইদ ও গফরগাঁওয়ের ত্রিমোহনীতে শীতলক্ষ্যা নদীকে দূষিত করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভালুকার দু’টি নদী, ৫টি খাল ও ৮টি বিল এখন বিপন্ন। নদী ও খাল-বিল তীরবর্তী এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। শিল্পবর্জ্যে জীব বৈচিত্র চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্র জানিয়েছে, বিষাক্ত শিল্পোবর্জ্যরে কারণে এখানকার কৃষিও হুমকির মুখে। জমির উর্বরাশক্তি নষ্ট হচ্ছে। ফসলে বিষক্রিয়ার মাত্রা বাড়ছে। কৃষক বাধ্য হচ্ছে নদীর তীরের জমিতেও বিকল্প সেচ ব্যবস্থা থেকে সেচ দিতে।
জানা গেছে, শুধু ভালুকার জমিরদিয়া গ্রামেই রয়েছে ১২টি কারখানা। এগুলো নিটিং অ্যান্ড ডাইং মিল। এসব কারখানার আরসিসি পাইপ লাইন থেকে অনবরত রঙিন বর্জ্য নির্গত হচ্ছে, যা লাউতি ও বিলাইজুড়ি খাল দূষণের উৎস।
সূত্র মতে, গ্যাস ফ্যাক্টরি নিট ফেব্রিজ ফ্যাশন, টেক্সটাইল কটন, স্পিনিং ইত্যাদি নামের বিভিন্ন শিল্পগ্রæপের ৩৫টি কারখানাই অপরিশোধিত বর্জ্যের উৎস। পাইপ লাইন, খাল, কৃষিজমি থেকে জলাশয়গুলোতে প্রবাহিত হচ্ছে দূষিত পানি। হবিরবাড়ির লাউতি খাল এখন বর্জ্য অপসারণের পাইপ লাইন।
পরিবেশ ও শিল্পায়ন নীতিমালা অনুসরণ না করে ভালুকা শিল্পাঞ্চলে কয়েক’শ কারখানা যুগের পর যুগ চললেও অধিকাংশ সময়ই ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) চালু রাখেনি বলে একই সূত্রের দাবি।
একটি বেসরকারি তথ্যে জানা গেছে, প্রতিটি কারখানা প্রতিদিন প্রায় ১০ লক্ষ লিটার তরল বর্জ্য সৃষ্টি করছে। বিপুল পরিমাণ এ বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করার কোনো ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। বর্জ্য মিশ্রিত পানিকেন্দ্রিক জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। অথচ শিল্পাঞ্চলে ইটিপি চালু রাখা জরুরি। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া চলা অসংখ্য শিল্প কারখানা ইটিপির ব্যবহার ছাড়াই চলে আসছে।
খোঁজ নিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ভালুকা পৌরএলাকায় খিরু নদীর পাড়ে অবস্থিত শেফার্ড ডায়িং ইন্ডাস্টিজের তিনটি ফ্যাক্টরী, হাজির বাজার এলাকায় আর্টি কম্পোজিট ও শাহাব ফেব্রিকস, কাশর গ্রামের অবস্থিত এ্যাডভান্স কম্পোজিট ও টিএম টেক্সটাইল, ভরাডোবা এলাকায় এ্যাক্সিপিরিয়েন্স টেক্সটাইল লিমিটেড, জামিরদিয়ায় এনভয় লিমিটেড, এমএল ডায়িং ও এন আরজি, ধামশুর এলাকায় কনজিউমার নীটেক্সসহ অর্ধশতাধিক ডায়িং ফ্যাক্টরী প্রশাসনের সাথে যোগসাজশ করে অধিকাংশ সময়ই ইটিপি বন্ধ রেখে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় পরিবেশবাদীরা বলছেন, প্রায় ৩০ বছর আগে যে শিল্পায়ন সম্ভাবনা উন্নয়নের জন্য সুবাতাস বইয়ে এনেছিল, এখন তার বাতাসে পঁচা গন্ধ। নষ্ট পানির কারণে মাৎস্য সম্পদ ধ্বংস ও কৃষিজ জমির ফলন প্রায় বিপন্নের পথে।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. অসীম কুমার নন্দী বলেন, এসব শিল্পকারখানার বর্জ্যে সাধারণ মানুষ নানা শারীরিক অসুস্থতার শিকার। হেভিমেটাল বা বিষাক্ত বর্জ্য এখন ভালুকা শিল্পাঞ্চলের মানুষের কাছে আশীর্বাদের তুলনায় অভিশাপ হয়ে উঠেছে। এ ভয়বাহ দূষণের টুটি চেপে ধরারও আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভালুকায় নিবিড় বনভূমি উজাড় করে এবং কৃষিজ জমি ও পাহাড়ি মাটি কেটে ৪ দশক আগে শিল্পায়নের যে ভিত্তি স্থাপন হয়েছিল, তা দেশকে শিল্পবিপ্লবের দিকে নিয়ে গেছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। কিন্তু উন্নয়ন অগ্রগতির নেপথ্যে ধ্বংসপপ্রাপ্ত হয়ে যাচ্ছে সবুজ প্রকৃতি।
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ুর উষ্ণায়ন নিয়ে উদ্বেগের চেয়েও শিল্প বর্জ্য নিয়ে উদ্বেগের মুখে পড়েছে ভালুকা। এ অঞ্চলের অধিবাসীরা অকল্পনীয় এক সঙ্কটের মুখোমুখি। তবে পরিবেশ দূষণের আগ্রাসন রুখতে এলাকাবাসী সোচ্চার। আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে। কিন্তু, গুটিকয়েক শিল্প দানবদের বেপরোয়া ঔদ্ধত্যে ভালুকার মাটি ও মানুষ মহাবিপর্যয়ের মুখে।
ভালুকার মিল ফ্যাক্টরিগুলোর ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ আগ্রসনের কথা স্বীকার করে পরিবেশ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের পরিচালক মো. ফরিদ আহমেদ বলেন, শিল্প-কারখানায় ইটিপি চালু রাখার জন্য আমাদের টিম সার্বক্ষনিক খোঁজ খবর রাখছেন।

Share.

Comments are closed.