Girl in a jacket

গফরগাঁওয়ে ড্রাম চিমনির ইটভাটায় কাঠ ব্যবহার: জনস্বাস্থ্য হুমকীর মুখে

0

স্টাফ রিপোর্টার, গফরগাঁও থেকে ফিরে:-
ময়মনসিংহে গফরগাঁও উপজেলা ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অসংখ্য ড্রাম চিমনির ইটভাটা। কৃষি জমি রক্ষার্থে ইটভাটা স্থাপনে আইন করে জায়গা সীমাবদ্ধ করে দেয়া হলেও গফরগাঁও উপজেলা ও পাগলা থানার গ্রামগঞ্জে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ইটভাটা। উর্বর জমিতে ইটভাটা তৈরীর ফলে উপজেলার সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে বলে কৃষি বিশেষজ্ঞরা দাবী করেন। তাদের মতে, বেশীর ভাগ ইটভাটার আশপাশের কৃষি জমির উপরিস্তরের মাটি দিয়ে ইট তৈরী করা হয় বলে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়। কিন্তু গফরগাঁও উপজেলা প্রসাশনকে ম্যানেজ করে ইটভাটার মালিকরা দেদারছে ইট তৈরী করে যাচ্ছে। উপজেলা প্রত্যান্ত অঞ্চলের অনেক ইটভাটার মালিকরা কয়লার পরিবর্তে জ্বালানী হিসাবে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন বনজ সস্পদ ধ্বংস হচ্ছে অপরদিকে ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য হুমকির সস্মুখীন হয়ে পড়েছে। ইটভাটা থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড ও সালফার ডাই-অক্সাইড সহ বিভিন্ন ধরনের কালো ধোঁয়া বাতাসে মিশে পরিবেশের মারাতœক ক্ষতি করে চলেছে বলে পরিবেশবাদীরা দাবী করেন। গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী কার্ষ্যালয় সূত্রে জানা যায়, এবার উপজেলা ৪০টি ইটভাটা চালু রয়েছে। এর মধ্যে ২৫/৩০টি ইটভাটার কোন ছাড়পত্র নেই। ইটভাটার মালিকরা এক অদৃশ্য ও স্থানীয় প্রশাসনকে অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে এবং আইন উপেক্ষা করে ভাটায় ইট পুড়িয়ে যাচ্ছে।
ইট পোড়ানো আইনে যা আছে ঃ সরকারীভাবে কোনো ইটভাটায় এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ইট পোড়ানোর অনুমোদন থাকলেও গফরগাঁওয়ে ইটভাটার মালিকরা ২০ থেকে ৪০ লাখ ইট পোড়ানো হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে সরকার লাখ লাখ টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতি মৌসুমে অর্থাৎ নভেম্বর থেকে মে মাস পর্ষন্ত ৬ মাসে একটি ইটভাটায় ৩০ লাখ ইট পোড়ানোর জন্য দেড় হাজার টন কাঠ জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হয়।
ইট ভাটা স্থাপন আইনে যা আছে ঃ ১৯৯০ সালের ২৫ জুলাই ভূমি মন্ত্রনালয় দেশব্যাপী জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, প্রত্যেক জেলা প্রশাসন ইটভাটা নিমার্ণের আবেদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করে অনুর্বর অকৃষি জমিতে ইটভাটা নিমার্ণের অনুমোদন দেবেন। যত্রতত্র ইটভাটা না হয়ে ইটভাটা হবে নদীর তীর অথবা বিশেষ কোনো এলাকার সর্বোচ্চ দেড় একর জায়গার ওপর। ১৯৮৯ সালের ১ জুলাই থেকে কার্ষকর হওয়া ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইনানুযায়ী ইট পোড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার জেলা প্রশাসক বরাবর দরখাস্ত পেশ করে লাইসেন্স নিতে হবে। লাইসেন্স ছাড়া কেউ ইট পোড়াতে পারবে না। এ আইনটির ধারা ৫-এ বলা হয়েছে কোনো ব্যক্তি ইট পোড়ানোর জন্য জ্বালানী ব্যবহার করতে পারবে না। এ আইনের কোন ধারা লঙ্ঘন হচ্ছে কি না তা যাচাইয়ের জন্য জেলা প্রশাসক অথবা তার দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা কোনো প্রকার নোটিশ ছাড়াই ইটভাটা পরিদর্শন করতে পারবেন। আইন লঙ্ঘনকৃত ইটভাটার সব ইট এবং জ্বালানী আটক করতে পারবেন। পরে বনজ সস্পদ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সরকার ১৮৯৯ সালে এক অধ্যাদেশ জারি করে ইট ভাটায় কাঠের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোঘনা করেছেন। আবার এ আইন ১৯৯১ সালের সংশোধনী করে প্রজ্ঞাপন জারি করে বলা হয়েছে, ইটভাটায় কাঠ পোড়ানোর অপরাধে ৩ বছরের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির(কর্মসূচীর) একজন পরিচালক জানান, কোনো লোকালয় বা জনবসতিপুর্ণ স্থানের ৩ কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন না করার নিয়মটি অনেক স্থানেই লঙ্ঘিত হচ্ছে। ইটভাটা স্থাপন এবং ইট পোড়ানো সংক্রান্ত বিধি বিধান প্রয়োগে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে তিনি জানান। গফরগাঁও উপজেলা বেশ কিছু সংখ্যক ইটভাটার মালিকরা আইন অমান্য করে ইট পোড়ানোর জন্য উপজেলার প্রশাসনকে অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে প্রতিদিন হাজার হাজার মন বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ-বনজ কাঠ জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করছে। তাছাড়াও আইন বহিভূর্তভাবে ইট ভাটার মালিকরা অতিরিক্ত ইট পোড়ানোর জন্য আরেক দফা সরকারী কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে ইট পোড়ানো হচ্ছে।
একটি ইটভাটার গল্প ঃ গফরগাঁও উপজেলার পাগলা থানার ১০টি ইটভাটা ড্রাম চিমনি দিয়ে ইট পুড়ছে। নিগুয়ারী ইউনিয়নে মাখল ইটভাটাকে ঘিরে রয়েছে অভিযোগের পাহাড়। ইটভাটার মালিক মোজাম্মেল হক ইটভাটার ছাড়পত্র ছাড়াই ড্রাম চিমনি দিয়ে ইট পুড়ছে। এ ইটভাটাকে ঘেঁসে তিন দিকে ঘনবসতিপূর্ন বাড়ি ও আবাসিক এলাকায় ইটভাটা স্থাপিত হওয়ায় কালো ধোঁয়ার প্রভাবে এলাকার আশ পাশের বসত-বাড়ি মানুষের জনস্থাস্থ্য এবং পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
অপরদিকে কেল্লার পাড় হাজী মমতাজ এলটিবি ইট ভাটার কালো ধোঁয়া ও ভাটার উড়ন্ত ছাইয়ে বসত ঘরসহ বিভিন্ন গাছ গাছড়ায় উপর কালো ধোঁয়ার আস্তরন ও উড়ন্ত ছাইয়ের কারনে ঘরে রাখা খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নানা ধরনের রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। আক্রান্ত হচ্ছে ফলবান বৃক্ষ ও গাছগাছালি। হাজী মমতাজ এলটিবি ট্রেডাস ইট ভাটার কালো ধোঁয়ায় আশ পাশের বাড়ি ঘরের মানুষের লাগানো ফলনের গাছ মরে যাচ্ছে। যেন দেখার কেউ নেই। এ ইট ভাটা শিশু শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বেশী।
এ প্রতিনিধি সরেজমিনে পাগলা থানা নিগুয়ারী ইউনিয়নে ১২টি ইটভাটা রয়েছে ১২টি ইটভাটা ড্রাম চিমনি মাধ্যমে ও কাঠ দিয়ে ইট পুড়ছে। কেল্লারপাড় এলটিবি ব্রিকস নামক ইট ভাটায় গিয়ে দেখা যায়, ড্রাম চিমনি দিয়ে ইট পুড়ছে কিন্তু ভাটা চালানোর কোনো ছাড়প্এ নেই আছে শুধু উপজেলার ফায়ার সাভির্স আগুন নেভানোর অনুমতি।
এ ব্যাপারে গফরগাঁও ইট ভাটা সমিতির সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক বলেন, আমাদের সমিতির আওতাধীন ১৪টি ইটভাটা চালু রয়েছে। বাকী ২৫/৩০টি ইটভাটা কি মূলে চালু রয়েছে তা আমরা বলতে পারব না। তবে আমাদেরকে বাচিঁয়ে পত্রিকায় লেইখেন। ভাটায় কাঠ পোড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইটভাটায় কয়লা দিয়েই ইট পোড়ানো হইতেছে। গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম মোবাইলে এ প্রতিনিধিকে বলেন, গফরগাঁও ও পাগলা থানায় কয়টি ইটভাটা ও ড্রাম চিমনি দিয়ে ইট পুড়ছেন এবং কয়টা হাওয়াই ভাটা চালু রয়েছে তা জেনে অচিরেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ময়মনসিংহ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক লোভানা জামিল মোবাইলে জানান, গফরগাঁও উপজেলা ও পাগলা থানার ইটভাটা বা ইট পোড়ানোর জন্য কোনো অনুমতি আমাদের কাছ থেকে নেইনি।

Share.

Comments are closed.